নিউজ ডেস্ক: ২০২৫ সালের স্মার্টফোন বাজারে মাঝারি বাজেটের (₹৩০,০০০–₹৩৫,০০০) সেগমেন্টে প্রতিযোগিতা তীব্রতর হয়েছে। পোকো, আইকু, ওয়ানপ্লাস এবং রিয়েলমির পাশাপাশি ভিভোও এই দৌড়ে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে। বছরের শুরুতে কোম্পানি বাজারে এনেছিল Vivo V50, আর মাত্র পাঁচ মাস পরই লঞ্চ করেছে এর উত্তরসূরি Vivo V60। এত দ্রুত পরবর্তী মডেলের আগমন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে— “নতুন কী?” উত্তর হচ্ছে, V60 এসেছে উন্নত Snapdragon 7 Gen 4 প্রসেসর, আরও উন্নত ক্যামেরা সেটআপ, এবং সবচেয়ে বড় চমক — টেলিফটো লেন্সের সংযোজন, যা V50-এ ছিল না। চলুন বিস্তারিত জানি।
ভিভো V60 ডিজাইনে স্পষ্ট ভিন্নতা এনেছে। V50-এর বড়সড় বৃত্তাকার ক্যামেরা মডিউলের পরিবর্তে এখানে ব্যবহার করা হয়েছে পিল-আকৃতির ক্যামেরা আইল্যান্ড, সঙ্গে রয়েছে রিং লাইট। মডিউলটি এবার ব্যাক প্যানেলের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে ডিজাইন করা হয়েছে, যা ফোনটিকে আরও প্রিমিয়াম এবং স্লিক লুক দিয়েছে। হাতে পাওয়া রিভিউ ইউনিটটির রঙ ছিল Auspicious Gold, যা যথেষ্ট পরিশীলিত ও আকর্ষণীয়। এছাড়াও রয়েছে Moonlit Blue টেক্সচার্ড ব্যাকসহ এবং Mist Gray প্লাস্টিক কম্পোজিট ফিনিশে।
ফোনটির ওজনের ভারসাম্য অত্যন্ত ভালোভাবে বজায় রাখা হয়েছে। কার্ভড সাইড ব্যবহারকারীর হাতে আরামদায়ক গ্রিপ দেয়, যদিও ফ্ল্যাট এজ থাকলে আরও মজবুত ধরা যেত। ডানদিকে ভলিউম রকার এবং পাওয়ার বাটন এমনভাবে বসানো হয়েছে যে সহজেই আঙুলের নাগালে আসে। নিচের দিকে রয়েছে USB Type-C পোর্ট, স্পিকার গ্রিল এবং সিম ট্রে।
ভিভো এবার টেকসইতায়ও নজর দিয়েছে। ফোনটিতে রয়েছে IP68 এবং IP69 সার্টিফিকেশন, অর্থাৎ এটি ১.৫ মিটার জলের নিচে ১২০ মিনিট পর্যন্ত টিকে থাকতে সক্ষম। সাথে রয়েছে Schott Core গ্লাস প্রটেকশন, যা V50-এর তুলনায় ৩৭% বেশি ড্রপ-রেজিস্ট্যান্ট। এই দিক থেকে V60 নিঃসন্দেহে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দৃঢ় এবং টেকসই V-সিরিজ স্মার্টফোন।
ডিসপ্লে সেকশনে ভিভো পুরনো ধারা বজায় রেখেছে, তবে কিছু উন্নতি এনেছে। V60-এ রয়েছে ৬.৭৭ ইঞ্চি AMOLED ডিসপ্লে, ফুল এইচডি+ রেজোলিউশন (2392 × 1080) এবং ১২০Hz অ্যাডাপ্টিভ রিফ্রেশ রেট। V50-এর তুলনায় এখানে পিক ব্রাইটনেস বেড়েছে ৪৫০০ নিট থেকে ৫০০০ নিটে, ফলে তীব্র রোদেও স্ক্রিন আরও স্পষ্ট দেখা যায়। এছাড়া রয়েছে HDR10+ সাপোর্ট এবং P3 কালার গামাট, যা কালার রিপ্রোডাকশনে গভীর কালো এবং প্রাণবন্ত রঙ দেয়। ইউটিউবে HDR কনটেন্ট স্ট্রিমিং হোক বা সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রলিং, V60-এর স্ক্রিনে এক অনন্য ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়।
সফটওয়্যার সাপোর্টেও ভিভো এবার বড় আপডেট এনেছে। V60 চলে FunTouch OS 15-এ, যা ভিত্তি করেছে Android 15-এর ওপর। ভিভো প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে ৪ বছরের মেজর OS আপডেট এবং ৬ বছরের সিকিউরিটি প্যাচ। ফলে ফোনটি এখন অনেকটাই ফিউচার-প্রুফ, যা V50-এ পাওয়া যায়নি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI ফিচারেও V60 অনেক এগিয়েছে। নতুন সংযোজনগুলির মধ্যে রয়েছে Reflection Remover, Magic Eraser, AI Move ইত্যাদি। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো AI Four Season Portraits ফিচারটি, যা ছবিতে মৌসুমি ব্যাকগ্রাউন্ড যুক্ত করতে দেয়। এছাড়াও রয়েছে AI Eraser ও Circle to Search, যা ব্যবহারকারীর প্রোডাক্টিভিটি ও ক্রিয়েটিভিটি দুইই বাড়ায়।
পারফরম্যান্সের দিক থেকে V60 একটি বড় আপগ্রেড। এখানে ব্যবহৃত হয়েছে Snapdragon 7 Gen 4 প্রসেসর, যা ৪nm প্রক্রিয়ায় নির্মিত এবং V50-এর Snapdragon 7 Gen 3-এর তুলনায় আরও কার্যকর ও শক্তিশালী। রিভিউ ইউনিটটিতে ছিল 8GB RAM + 256GB স্টোরেজ, তবে সর্বোচ্চ 16GB + 512GB ভ্যারিয়েন্টও পাওয়া যাবে। যদিও স্টোরেজ এখনও UFS 2.2 প্রযুক্তিভিত্তিক, যা কিছু প্রতিযোগী ডিভাইসের UFS 3.1-এর তুলনায় ধীর।
বেঞ্চমার্ক স্কোর অনুযায়ী, V60 অর্জন করেছে ১,১৯৯ সিঙ্গেল-কোর, ৩,৩৫১ মাল্টি-কোর, ৪,৬০৩ GPU স্কোর এবং Antutu ৯৫৬,০৬৬ পয়েন্ট। এটি শক্তিশালী মিড-রেঞ্জ পারফরম্যান্স প্রদান করে, যদিও Poco F7 এবং iQOO Neo 10-এর মতো Snapdragon 8 সিরিজের ফোনগুলি কাঁচা শক্তিতে এগিয়ে।
গেমিং পারফরম্যান্সও যথেষ্ট ভালো। BGMI এবং Call of Duty Mobile-এর মতো জনপ্রিয় গেমস হাই সেটিংসে মসৃণভাবে চলেছে। উন্নত কুলিং সিস্টেম দীর্ঘক্ষণ গেম খেলার পরও ফোনের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।
ক্যামেরা সেকশনে V60 এনেছে বিশাল পরিবর্তন। এবার Zeiss সহযোগিতায় নির্মিত ট্রিপল-ক্যামেরা সেটআপ ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে রয়েছে ৫০MP OIS প্রাইমারি সেন্সর (Sony IMX776), ৫০MP টেলিফটো লেন্স (Sony IMX882, 2x অপটিক্যাল জুম) এবং ৮MP আলট্রাওয়াইড লেন্স।
দিনের আলোয় তোলা ছবিতে ডিটেল দুর্দান্ত, ডাইনামিক রেঞ্জ উন্নত, এবং রঙগুলি আরও প্রাণবন্ত। টেলিফটো লেন্স পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফিতে গভীরতা ও স্বচ্ছতা এনে দিয়েছে। যদিও জটিল ব্যাকগ্রাউন্ডে এজ ডিটেকশন মাঝে মাঝে সমস্যায় ফেলে। ভিভো নতুন Stage Mode যুক্ত করেছে, যা ডিজিটাল জুম ১০x পর্যন্ত উন্নত করে, যদিও সবসময় সঠিকভাবে টেলিফটো লেন্সে স্যুইচ করে না।
লো-লাইট ফটোগ্রাফিতেও V60 যথেষ্ট ভালো পারফর্ম করেছে। Aura Light এবং AI উন্নয়ন অন্ধকার দৃশ্য উজ্জ্বল করে তোলে, যদিও মাঝে মাঝে গ্রেইন ধরা পড়ে। V50-এর তুলনায় নাইট ফটোগ্রাফি এখানে নিঃসন্দেহে উন্নত।
সেলফি ক্যামেরাও সমান শক্তিশালী। ৫০MP Zeiss ফ্রন্ট ক্যামেরা শার্প এবং ডিটেলড ছবি দেয়। যদিও ভিভো এখানে হালকা কনট্রাস্টি স্কিন টোন ব্যবহার করেছে, যা সবসময় প্রাকৃতিক না হলেও সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য দারুণ।
ব্যাটারি সেকশনে ভিভো বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। ৬,৫০০mAh ব্যাটারি আগের ৬,০০০mAh থেকে উন্নত। মাঝারি থেকে ভারী ব্যবহারেও ফোনটি প্রায় দেড় দিনের বেশি ব্যাকআপ দেয়।
চার্জিং স্পিড ৯০W ফাস্ট চার্জিং-এ অপরিবর্তিত রয়েছে। ২০% থেকে ১০০% চার্জ হতে প্রায় ৪০ মিনিট সময় লাগে। যদিও কিছু প্রতিযোগী এখন ১২০W বা তার বেশি ফাস্ট চার্জিং দিচ্ছে, তবু ব্যাটারি ব্যাকআপের ক্ষেত্রে V60 অনেক এগিয়ে।
সর্বশেষ রায়, Vivo V60 নিঃসন্দেহে V50-এর যোগ্য উত্তরসূরি। উন্নত ডিজাইন, উজ্জ্বল ডিসপ্লে, দীর্ঘ ব্যাটারি লাইফ এবং বিশেষত টেলিফটো লেন্সসহ উন্নত ট্রিপল ক্যামেরা সেটআপ ফোনটিকে বাজারে আলাদা জায়গায় দাঁড় করিয়েছে। যদিও ₹৩৬,৯৯৯ দামের কারণে কিছু ব্যবহারকারী শক্তিশালী প্রসেসরযুক্ত OnePlus Nord 5, Poco F7 বা iQOO Neo 10 বিবেচনা করতে পারেন, তবু ডিজাইন, ফিচার এবং ফটোগ্রাফির জন্য V60 এক আকর্ষণীয় পছন্দ।
যারা দীর্ঘমেয়াদি সফটওয়্যার সাপোর্ট, উন্নত ক্যামেরা, টেকসই বিল্ড এবং বড় ব্যাটারি চান, তাদের জন্য Vivo V60 নিঃসন্দেহে মাঝারি বাজেটের মধ্যে অন্যতম সেরা বিকল্প।

