নিউজ ডেস্ক: অ্যান্ড্রয়েডের ফোন অ্যাপ্লিকেশন হঠাৎ করে নতুন রূপে হাজির হওয়ায় বিশ্বজুড়ে ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষের জন্ম হয়েছে। কোনো পূর্ব ঘোষণা বা ব্যবহারকারীর সম্মতি ছাড়াই গুগল হঠাৎই এই আপডেট চালু করেছে, যা নিয়ে নানা বিতর্ক শুরু হয়েছে। অনেকে অভিযোগ করেছেন, এই নতুন ডিজাইন ব্যবহারকারীর অভ্যাসে হস্তক্ষেপ করছে এবং অ্যাপের সৌন্দর্য ও ব্যবহারযোগ্যতা নষ্ট করছে।
নতুন ডিজাইনে ফোন অ্যাপের মূল ফাংশনগুলির বোতাম যেমন কল কাটা, মিউট করা এবং স্পিকারফোন চালু করার অপশনগুলো অনেক বড় এবং মোটা আকারে প্রদর্শিত হচ্ছে। পূর্বের তুলনায় কন্ট্যাক্ট লিস্ট ও কল হিস্টরির লেআউটেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রতিটি এন্ট্রির মধ্যে আলাদা করে অনুভূমিক রেখা ব্যবহার করা হয়েছে, যা অনেক ব্যবহারকারীর কাছে অপ্রয়োজনীয় ও জটিল মনে হচ্ছে।
এছাড়াও, কল রিসিভ ও রিজেক্ট করার জন্য নতুন করে স্লাইডিং মেকানিজম যুক্ত করা হয়েছে, যা আইফোনের স্টাইলের সঙ্গে অনেকটাই মিলে যায়। যদিও অনেক ব্যবহারকারী এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানাননি। কারণ, বেশিরভাগেরই অভিযোগ যে, তারা কোনো আপডেট নোটিফিকেশন পাননি এবং হঠাৎ করেই নতুন ইন্টারফেসের মুখোমুখি হয়েছেন।
ব্যবহারকারীদের ক্ষোভের জোয়ার সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। রেডিট, এক্স (পূর্বের টুইটার) এবং অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে হাজার হাজার মন্তব্যে ব্যবহারকারীরা নিজেদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এক ব্যবহারকারী রেডিটে লিখেছেন, “ফোন অ্যাপটা আগের মতোই নিখুঁত ছিল। এখন বোতামগুলো বিশাল, ভারী আর ভয়ানক দেখতে! কে ভেবেছে এটা ভালো আইডিয়া?” আরেকজন বিরক্ত হয়ে মন্তব্য করেছেন, “এটা কেমন বিশাল অগোছালো এলোমেলো ডিজাইন! আমি তো অন্ধ নই, ভাই!”
বিশেষ করে কল কেটে দেওয়ার বোতামটি, যা এখন বড় আকারে এবং উজ্জ্বল লাল রঙে প্রদর্শিত হয়, অনেক ব্যবহারকারীর চোখে অত্যন্ত বিরক্তিকর মনে হচ্ছে। পূর্বের তুলনায় ইন্টারফেসের সরলতা হারিয়ে গেছে এবং এখনকার ভিজ্যুয়াল উপাদানগুলো অনেকের কাছেই বেমানান মনে হচ্ছে।
তবে, সমালোচনার পাশাপাশি কিছু ব্যবহারকারী এই নতুন ডিজাইনকে স্বাগতও জানিয়েছেন। বিশেষ করে যেসব ব্যবহারকারীর ছোট বোতামে চাপ দিতে অসুবিধা হয়, তাদের মতে নতুন বড় বোতামগুলো ব্যবহারে সুবিধা এনে দিচ্ছে। কিন্তু এখানেই বড় প্রশ্ন — গুগল কেন ব্যবহারকারীদের মতামত নেওয়া বা অপ্ট-আউটের সুযোগ না দিয়ে সরাসরি পরিবর্তন চাপিয়ে দিল?
নতুন আপডেটটি আসলে গুগলের “Material 3 Expressive Redesign” প্রকল্পের অংশ। গুগল দাবি করেছে, এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য ছিল আধুনিক নান্দনিকতা আনা এবং ব্যবহারযোগ্যতা উন্নত করা। কিন্তু ব্যবহারকারীদের অসন্তোষের মূল কারণ হলো, এই পরিবর্তন কোনো সতর্কতা বা বিকল্প ছাড়াই কার্যকর করা হয়েছে।
নতুন ডিজাইনে শুধু বোতামই নয়, ফোন অ্যাপের বিভিন্ন সেকশনেও পরিবর্তন এসেছে। আগে “Favourites” এবং “Recent Calls” আলাদা ট্যাব আকারে থাকলেও এখন সেগুলো একত্রিত করে নতুন “Home” ট্যাবে দেখানো হচ্ছে। এখানে প্রিয় কন্ট্যাক্ট ও সাম্প্রতিক কল একসঙ্গে কার্ড আকারে প্রদর্শিত হয়। এছাড়াও, ডায়ালার বা কিপ্যাড এখন আলাদা একটি ট্যাবে রাখা হয়েছে এবং সেখানে পূর্বের তীক্ষ্ণ কোণের বোতামের পরিবর্তে গোলাকার বোতাম ব্যবহার করা হয়েছে।
ব্যবহারকারীদের অনেকেই জানিয়েছেন যে, স্লাইড করে কল রিসিভ বা রিজেক্ট করার নতুন ফিচারটি সেটিংস থেকে পুরনো এক-ক্লিক সিস্টেমে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব। কিন্তু দুঃখের বিষয়, নতুন লেআউট, বোতামের আকার বা ডিজাইন পরিবর্তনের জন্য কোনো বিকল্প দেওয়া হয়নি। ফলে অনেক ব্যবহারকারী বাধ্য হয়ে অ্যাপের আপডেট আনইনস্টল করে পুরনো ভার্সনে ফিরে গেছেন। যদিও এই সমাধান সবার জন্য সহজ নয়।
সোশ্যাল মিডিয়ায় চলমান প্রতিক্রিয়ার জোর দেখে বোঝা যাচ্ছে, গুগলের এই পরিবর্তনকে ঘিরে ব্যবহারকারীদের অসন্তোষ তীব্র আকার ধারণ করেছে। একসময় যেটি ছিল সাধারণ এবং স্বাভাবিক একটি টুল, সেই ফোন অ্যাপই এখন ব্যবহারকারীদের আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
গুগলের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি আসেনি যে, ব্যবহারকারীদের প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে নতুন কোনো আপডেট আনা হবে কি না। তবে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যবহারকারীদের মতামত উপেক্ষা করে কোনো ইন্টারফেস আপডেট চাপিয়ে দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত হতে পারে। বিশেষ করে অ্যান্ড্রয়েডের মতো বিশাল ব্যবহারকারীভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে এমন হঠাৎ পরিবর্তন ব্র্যান্ড ইমেজের ক্ষতি করতে পারে।
যদিও কিছু ব্যবহারকারী বড় বোতাম ও নতুন লেআউটকে বেশি ব্যবহারবান্ধব মনে করছেন, তবুও অধিকাংশই পূর্বের সরল, পরিষ্কার ও মিনিমালিস্ট ডিজাইন ফিরে পেতে চান। ফলে এখন প্রশ্ন হলো, গুগল কি তাদের মতামত শোনার প্রয়োজন অনুভব করবে, নাকি এই নতুন ইন্টারফেসকেই স্থায়ীভাবে বজায় রাখবে।
যদি গুগল ব্যবহারকারীদের পছন্দকে গুরুত্ব না দেয়, তাহলে অনেকেই হয়তো বিকল্প ডায়ালার অ্যাপের দিকে ঝুঁকতে পারেন। ইতিমধ্যেই কিছু ব্যবহারকারী থার্ড-পার্টি ফোন অ্যাপ ইনস্টল করে আগের মতো অভিজ্ঞতা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য এই সমাধান জটিল এবং দীর্ঘমেয়াদি নয়।
এই আপডেটকে ঘিরে চলমান বিতর্ক থেকে বোঝা যাচ্ছে, শুধুমাত্র “আধুনিক” ও “আকর্ষণীয়” করার লক্ষ্যেই ডিজাইন পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; ব্যবহারকারীর অভ্যাস, আরামদায়ক ব্যবহারযোগ্যতা ও কাস্টমাইজেশনের সুযোগও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আর সেটিই হয়তো এই ঘটনার বড় শিক্ষা হতে পারে গুগলের জন্য।
যেভাবেই হোক, আপাতত নতুন ডিজাইনই অ্যান্ড্রয়েড ফোন অ্যাপের জন্য স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে থাকবে। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষোভ ও ব্যবহারকারীদের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হচ্ছে, গুগলকে হয়তো ভবিষ্যতে কিছু বিকল্প ফিচার আনতে বাধ্য হতে হবে। নাহলে, ব্যবহারকারীদের বিরক্তি আরও বাড়তে পারে।
আপডেটটি যেভাবেই হোক না কেন, এটি স্পষ্ট যে ফোন অ্যাপের নতুন রূপ অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীদের দৈনন্দিন অভ্যাসে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। গুগলের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ হলো ব্যবহারকারীদের প্রত্যাশা ও কোম্পানির নকশাগত দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সঠিক ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া।

