নিউজ ডেস্ক: অ্যাপল তাদের ভবিষ্যৎ আইফোন সিরিজে ট্যান্ডেম ওএলইডি (Tandem OLED) প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে গুরুত্বসহকারে কাজ করছে। শিল্প সূত্রে জানা গেছে, ২০২৮ সালের দিকে এই আপগ্রেড কার্যকর হতে পারে। বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তি নির্মাতা অ্যাপল, তার ডিভাইসের ডিসপ্লে কোয়ালিটি ও এনার্জি এফিশিয়েন্সি উন্নত করার লক্ষ্যে নতুন উদ্ভাবনের পথে হাঁটছে। এই প্রক্রিয়ায় অ্যাপলের অন্যতম প্রধান সাপ্লায়ার এলজি ডিসপ্লে (LG Display) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, যারা এই প্রযুক্তির বিকাশে দীর্ঘদিন ধরেই অগ্রণী অবস্থানে রয়েছে।
ট্যান্ডেম ওএলইডি প্যানেল প্রচলিত সিঙ্গল-লেয়ার ওএলইডি স্ক্রিনের থেকে ভিন্ন। সাধারণত আইফোনে ব্যবহৃত বর্তমান ওএলইডি প্যানেলগুলিতে একক স্তরের ইমিশন লেয়ার থাকে, কিন্তু ট্যান্ডেম ওএলইডি প্রযুক্তিতে দুটি জৈব আলো-নিঃসরণকারী স্তর একটির উপর আরেকটি স্থাপন করা হয়। এর ফলে ডিসপ্লে আরও বেশি উজ্জ্বল হয়, কম বিদ্যুৎ খরচ হয় এবং প্যানেলের স্থায়িত্বও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। ফলে ব্যবহারকারীরা আরও উন্নত ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতা পাবেন, পাশাপাশি ব্যাটারির স্থায়িত্বও তুলনামূলকভাবে ভালো হবে।
এই প্রযুক্তির প্রাথমিক সফল প্রয়োগ ইতিমধ্যেই অ্যাপলের এম৪ আইপ্যাড প্রো (M4 iPad Pro) মডেলে দেখা গেছে। এই মডেলের ডিসপ্লে তৈরিতে এলজি ডিসপ্লে অধিকাংশ প্যানেল সরবরাহ করেছে, বাকি অংশটি সরবরাহ করেছে স্যামসাং। এই সফল বাস্তবায়ন অ্যাপলকে আরও আত্মবিশ্বাসী করেছে যে, ট্যান্ডেম ওএলইডি ভবিষ্যতের আইফোনেও ব্যবহার করা সম্ভব।
এলজি ডিসপ্লে এই ক্ষেত্রে বেশ কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে গবেষণা ও উন্নয়নের কাজ করে চলেছে। কোম্পানিটির কাছে বর্তমানে ৩০০টিরও বেশি ট্যান্ডেম ওএলইডি সম্পর্কিত পেটেন্ট রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে তারা এই প্রযুক্তিতে শিল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছে। তবে দুটি ইমিশন লেয়ার একসঙ্গে ব্যবহার করার কারণে উৎপাদন প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে জটিল এবং ধীর হয়ে যেতে পারে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এলজি নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে, যাতে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো যায় এবং ভবিষ্যতের বাড়তি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়।
খবরে আরও জানা গেছে যে, অ্যাপল শুধুমাত্র প্রচলিত ট্যান্ডেম ওএলইডি ডিজাইন নয়, বরং এর একটি সরলীকৃত সংস্করণও (Simplified Tandem OLED) মূল্যায়ন করছে। এই সরলীকৃত সংস্করণে নীল সাব-পিক্সেল দুটি স্তরের ইমিশন লেয়ার ব্যবহার করবে, অথচ লাল ও সবুজ সাব-পিক্সেল একক স্তরেই থাকবে। এই পদ্ধতিতে ডিসপ্লের উজ্জ্বলতা এবং স্থায়িত্বের সুবিধা বজায় রাখা সম্ভব, আবার উৎপাদন খরচ ও সময়ও কমিয়ে আনা যাবে।
অন্যদিকে, অ্যাপল এই প্রযুক্তি গ্রহণের ক্ষেত্রে একক সাপ্লায়ারের উপর নির্ভরশীল থাকতে চায় না। যদিও এলজি ডিসপ্লে এই ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছে, তবে বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে স্যামসাং (Samsung) এবং বিওই (BOE)-কেও এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। এর ফলে সরবরাহ চেইন আরও শক্তিশালী হবে এবং উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে। এরই মধ্যে বিওই ২০২৩ সালে অনার ম্যাজিক ৬ পোরশে ডিজাইন এডিশন (Honor Magic 6 Porsche Design Edition)-এর জন্য ট্যান্ডেম ওএলইডি প্যানেল সরবরাহ করেছে। যদিও তা ছিল সীমিত পরিসরে, তবে এটি প্রমাণ করে যে প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিক ডিভাইসে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব।
তবে অ্যাপলের পরিকল্পনা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। যেহেতু বাজারে এই প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা ও উৎপাদন প্রক্রিয়া এখনো দ্রুত পরিবর্তনশীল, তাই ২০২৮ সালের আগে পরিস্থিতির উপর ভিত্তি করে অ্যাপল তাদের কৌশলে পরিবর্তন আনতেও পারে। তবুও বর্তমান সমস্ত ইঙ্গিতই দেখাচ্ছে যে, অ্যাপল ভবিষ্যতের আইফোনে আরও উজ্জ্বল, শক্তি-সাশ্রয়ী এবং টেকসই ডিসপ্লে আনতে প্রস্তুত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্যান্ডেম ওএলইডি প্রযুক্তি যদি আইফোনে ব্যবহৃত হয়, তবে এটি শিল্পে একটি নতুন মানদণ্ড তৈরি করবে। বর্তমানে অনেক প্রতিযোগী ব্র্যান্ড যেমন স্যামসাং, শাওমি, অপ্পো এবং ভিভো ডিসপ্লে প্রযুক্তির উন্নয়নে ক্রমাগত বিনিয়োগ করছে, কিন্তু অ্যাপলের এই পদক্ষেপ স্মার্টফোন শিল্পে একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে। উচ্চ উজ্জ্বলতা, দীর্ঘস্থায়ী প্যানেল এবং কম বিদ্যুৎ খরচ—এই তিনটি সুবিধা আইফোন ব্যবহারকারীদের জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে আসবে।
যদি অ্যাপল ২০২৮ সালে তাদের আইফোন সিরিজে এই প্রযুক্তি চালু করে, তবে এটি শুধু ব্যবহারকারীদের জন্য নয়, বরং পুরো স্মার্টফোন শিল্পের জন্যই একটি মাইলফলক হয়ে উঠবে। উন্নত ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতা, ব্যাটারি সাশ্রয় এবং ডিসপ্লের দীর্ঘস্থায়ী পারফরম্যান্স—এই তিনের সমন্বয়ে ট্যান্ডেম ওএলইডি প্রযুক্তি আগামী দশকের স্মার্টফোন ডিজাইনের মানদণ্ড গড়ে দিতে পারে।

