নিউজ ডেস্ক : বিশ্বব্যাপী স্মার্টফোন বাজারে প্রতিনিয়ত নতুনত্ব নিয়ে আসছে প্রযুক্তি সংস্থাগুলি। সেই ধারায় এবার দক্ষিণ কোরিয়ার শীর্ষ প্রযুক্তি সংস্থা স্যামসাং ভারতে এনেছে তাদের সর্বশেষ ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টফোন—স্যামসাং গ্যালাক্সি এস২৪ আল্ট্রা ৫জি ২০২৫। অত্যাধুনিক ফিচার এবং শক্তিশালী পারফরম্যান্স নিয়ে বাজারে প্রবেশ করা এই ফোন ইতিমধ্যেই আলোড়ন তুলেছে প্রযুক্তিপ্রেমীদের মধ্যে। ২০০ মেগাপিক্সেল ক্যামেরা, টাইটানিয়াম ফ্রেম, ডায়নামিক AMOLED 2X ডিসপ্লে সহ একের পর এক অভিনব বৈশিষ্ট্য নিয়ে এটি নিঃসন্দেহে প্রিমিয়াম স্মার্টফোন সেগমেন্টে স্যামসাংয়ের শক্ত অবস্থানকে আরও দৃঢ় করবে। ভারতে এর দাম শুরু হয়েছে প্রায় ৮৪,১৮৪ টাকা থেকে, আর সর্বোচ্চ ভ্যারিয়েন্টের দাম পৌঁছেছে ১,১৯,৯৯৯ টাকায়। ফলে, যারা প্রিমিয়াম গুণমানের ডিভাইস পছন্দ করেন, কর্মজীবনে নির্ভরযোগ্য স্মার্টফোন চান বা প্রযুক্তির সর্বশেষ স্বাদ নিতে চান, তাদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় আকর্ষণ।
স্যামসাং বরাবরই তাদের ফ্ল্যাগশিপ ফোনগুলিতে নজরকাড়া নকশা, শক্তিশালী হার্ডওয়্যার এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যবহারের সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করে। এই ডিভাইসের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ফোনটির দৈর্ঘ্য ১৬২.৩ মিলিমিটার, প্রস্থ ৭৯ মিলিমিটার এবং পুরুত্ব মাত্র ৮.৬ মিলিমিটার। ওজন প্রায় ২৩২ থেকে ২৩৩ গ্রাম হওয়ায় হাতে ধরলে মজবুত অনুভূতি দেয়। ব্যবহার করা হয়েছে প্রিমিয়াম মানের গ্লাস ফ্রন্ট প্যানেল এবং শক্তিশালী টাইটানিয়াম ফ্রেম, যা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে স্থায়িত্ব বজায় রাখে। ফোনটি আইপি৬৮ সার্টিফাইড হওয়ায় এটি জল ও ধুলো প্রতিরোধে সক্ষম, ফলে হঠাৎ বৃষ্টিতে বা দুর্ঘটনাবশত জলে পড়লেও ডিভাইসের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা কম। রঙের দিক থেকে এসেছে মূলত দুটি প্রিমিয়াম ভ্যারিয়েন্ট—টাইটানিয়াম গ্রে ও টাইটানিয়াম ভায়োলেট, যা আধুনিক ব্যবহারকারীদের নান্দনিক রুচিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। মসৃণ ফ্লাশ ডিজাইন ফোনটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
ডিসপ্লের দিক থেকে স্যামসাং গ্যালাক্সি এস২৪ আল্ট্রা ৫জি ২০২৫ সত্যিই অনন্য। এতে ব্যবহার করা হয়েছে বিশাল ৬.৮ ইঞ্চি ডায়নামিক AMOLED 2X স্ক্রিন, যার রেজোলিউশন ১৪৪০ x ৩১২০ পিক্সেল। ফলে প্রতিটি ছবি ও ভিডিও দেখা যায় অত্যন্ত স্পষ্ট এবং জীবন্ত রঙে। পিক্সেল ডেনসিটি ৫০৫ পিপিআই হওয়ায় টেক্সট থেকে শুরু করে ছবি—সবকিছুই চোখের আরামদায়কভাবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্ক্রিনটি ১২০ হার্টজ অ্যাডাপ্টিভ রিফ্রেশ রেট সমর্থন করে, ফলে ব্যবহারকারী কন্টেন্ট অনুযায়ী মসৃণ স্ক্রলিং ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া উপভোগ করতে পারবেন। এই ডিসপ্লে HDR10+ সাপোর্ট করে এবং সর্বোচ্চ উজ্জ্বলতা পৌঁছাতে পারে ২৬০০ নিট পর্যন্ত। তাই সরাসরি রোদেও স্ক্রিন পড়তে অসুবিধা হয় না। সিকিউরিটির জন্য রয়েছে আল্ট্রাসনিক ইন-ডিসপ্লে ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর এবং চোখের আরামের জন্য বিশেষ আই-কমফোর্ট মোড, যা দীর্ঘ গেমিং বা ভিডিও দেখার সময় ব্লু লাইট কমিয়ে চোখের ক্ষতি কমায়।
পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রে এই ফোনে রয়েছে বাজারের অন্যতম শক্তিশালী প্রসেসর—কোয়ালকম স্ন্যাপড্রাগন ৮ জেন ৪। এটি সর্বশেষ প্রজন্মের মোবাইল প্রসেসর, যা বহুমুখী কাজ, উচ্চক্ষমতার গেমিং কিংবা রিসোর্স-নির্ভর অ্যাপ্লিকেশন সবকিছুই সহজে সামলাতে সক্ষম। ফোনটির কনফিগারেশন ভ্যারিয়েন্ট পাওয়া যায় ১২ জিবি থেকে ১৬ জিবি র্যাম পর্যন্ত, আর স্টোরেজ শুরু হচ্ছে ২৫৬ জিবি থেকে, সর্বোচ্চ ভ্যারিয়েন্টে রয়েছে ১ টেরাবাইট পর্যন্ত জায়গা। এর ব্যাটারি পারফরম্যান্সও প্রশংসনীয়। ব্যবহারকারীদের দাবি, ভারী ব্যবহারেও একবার চার্জে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা সহজেই চলে যায়। ফলে দিনের পর দিন যারা অফিসিয়াল কাজে বা ক্রিয়েটিভ প্রজেক্টে ফোনের উপর নির্ভর করেন, তাদের জন্য এটি দারুণ কার্যকর।
আরও পড়ুনঃ প্রিমিয়াম বাজেটে সেরা বিকল্প Oppo F27 Pro Plus 5G
ক্যামেরা সিস্টেম নিয়ে বলতে গেলে, স্যামসাং আবারও তাদের দক্ষতা প্রমাণ করেছে। এই ফোনের মূল আকর্ষণ ২০০ মেগাপিক্সেল প্রধান সেন্সর, যা অপটিক্যাল ইমেজ স্ট্যাবিলাইজেশন সমর্থন করে। ফলে কম আলোতেও ছবি হয় ঝকঝকে ও বিস্তারিত। এর সঙ্গে রয়েছে ৫০ মেগাপিক্সেল পেরিস্কোপ টেলিফটো লেন্স, যা ৫x অপটিক্যাল জুম সুবিধা দেয়। এছাড়াও রয়েছে ১২ মেগাপিক্সেল আল্ট্রা-ওয়াইড লেন্স, যা প্রশস্ত ল্যান্ডস্কেপ বা গ্রুপ ফটো তুলতে কাজে লাগে, আর একটি ১০ মেগাপিক্সেল টেলিফটো লেন্স ৩x অপটিক্যাল জুম সুবিধা দেয়। সেলফি এবং ভিডিও কলের জন্য সামনে রয়েছে ১২ মেগাপিক্সেল ফ্রন্ট ক্যামেরা। ক্যামেরায় সংযুক্ত করা হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তি, যা শুটিং কন্ডিশন অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেটিংস অপ্টিমাইজ করে। ভিডিও রেকর্ডিং সম্ভব ৮কে রেজোলিউশনে প্রতি সেকেন্ডে ৩০ ফ্রেম গতিতে। এছাড়াও বিশেষ নাইটোগ্রাফি মোড থাকায় অন্ধকারেও ছবি বা ভিডিও ধারণ করা যায় পরিষ্কারভাবে।
ব্যাটারির দিক থেকে ফোনে রয়েছে ৫০০০ এমএএইচ ক্যাপাসিটির পাওয়ারফুল ব্যাটারি, যা ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা ভারী ব্যবহারেও আরামে টিকে যায়। চার্জিং সিস্টেমও আধুনিক—৪৫ ওয়াট ফাস্ট চার্জিং সাপোর্ট করে, যা মাত্র ৩০ মিনিটে ব্যাটারিকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত চার্জ করতে সক্ষম। তার পাশাপাশি রয়েছে ১৫ ওয়াট ওয়্যারলেস চার্জিং সুবিধা, ফলে ক্যাবল ছাড়াই সহজে চার্জ করা যায়। দৈনিক ব্যবহার হিসেব করলে এর রানিং খরচ দাঁড়ায় মাত্র ০.৫ থেকে ১ টাকা পর্যন্ত, যা ব্যবহারকারীদের কাছে যথেষ্ট সাশ্রয়ী।
সংযোগের দিক থেকে ফোনটি সর্বাধুনিক ফিচার নিয়ে এসেছে। ৫জি সাপোর্ট থাকায় দ্রুত ইন্টারনেট ব্যবহার করা যায়। রয়েছে সর্বশেষ Wi-Fi 7 প্রযুক্তি এবং Bluetooth 5.3, যা নিরবচ্ছিন্নভাবে অন্যান্য ডিভাইসের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে। অডিও অভিজ্ঞতার জন্য আছে ডলবি অ্যাটমস সমৃদ্ধ স্টেরিও স্পিকার, যা সিনেমা বা গান শোনার অভিজ্ঞতাকে আরও জীবন্ত করে তোলে। তবে স্যামসাং প্রচলিত ৩.৫ মিমি হেডফোন জ্যাক সরিয়ে দিয়েছে, তাই ব্যবহারকারীদের ওয়্যারলেস হেডফোন বা ইউএসবি-সি অ্যাডাপ্টারের উপর নির্ভর করতে হবে।
ভারতে ফোনটির দাম রাখা হয়েছে বেশ প্রিমিয়াম রেঞ্জে। বেস ভ্যারিয়েন্টের এক্স-শোরুম দাম ৮৪,১৮৪ টাকা থেকে শুরু হয়ে সর্বোচ্চ ভ্যারিয়েন্টে পৌঁছেছে ১,১৯,৯৯৯ টাকায়। অন-রোড প্রাইস শহরভেদে ভিন্ন—যেমন দিল্লিতে দাম দাঁড়াচ্ছে ৯৫,০০০ থেকে ১.৩৫ লক্ষ টাকার মধ্যে। এতে রেজিস্ট্রেশন খরচ ৫,০০০ থেকে ৭,০০০ টাকা এবং ইন্স্যুরেন্স চার্জ ২,০০০ থেকে ৩,০০০ টাকা যোগ হচ্ছে। ডিভাইসটি বাজারে এসেছে জানুয়ারি ২০২৫-এ এবং উৎসবের মরশুমে বিশেষ অফার বা ডিসকাউন্ট পাওয়া যাচ্ছে। বার্ষিক মেইনটেন্যান্স খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা। তবে ডেলিভারি পেতে অনেক সময় ১৫ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। এক বছরের ওয়ারেন্টি বা সর্বোচ্চ ২০,০০০ ঘণ্টা ব্যবহারের গ্যারান্টি দিচ্ছে সংস্থা।
গ্রাহকদের প্রতিক্রিয়া ইতিমধ্যেই ইতিবাচক। ব্যবহারকারীরা বিশেষভাবে প্রশংসা করেছেন ফোনের ক্যামেরা পারফরম্যান্স, স্ক্রিনের গুণমান ও সামগ্রিক পারফরম্যান্সের। ৮.৬ মিলিমিটারের স্লিম ডিজাইন এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যাটারি ব্যবহারকারীদের কাছে আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে। তবে কিছু অসুবিধার কথাও উঠে এসেছে—যেমন বেস ভ্যারিয়েন্টের দাম তুলনামূলকভাবে বেশি, চার্জিং স্পিড আরও দ্রুত হতে পারত, আর ওজন কিছুটা ভারী হওয়ায় অনেকেই দীর্ঘক্ষণ ব্যবহারে অস্বস্তি অনুভব করছেন।
সবশেষে বলা যায়, স্যামসাং গ্যালাক্সি এস২৪ আল্ট্রা ৫জি ২০২৫ একটি পূর্ণাঙ্গ ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টফোন, যেখানে ক্যামেরা, ডিসপ্লে ও পারফরম্যান্স সব ক্ষেত্রেই সেরা মান বজায় রাখা হয়েছে। জানুয়ারি ২০২৫-এ বাজারে আসা এই ফোনের দাম ৮৪,১৮৪ টাকা থেকে ১,১৯,৯৯৯ টাকার মধ্যে হলেও এটি নিঃসন্দেহে প্রিমিয়াম ব্যবহারকারীদের জন্য দারুণ একটি বিকল্প। বিশেষ করে যারা ফটোগ্রাফি, ভিডিওগ্রাফি কিংবা আধুনিক প্রযুক্তির সব ফিচার একসঙ্গে চান, তাদের জন্য এটি অন্যতম সেরা পছন্দ হতে পারে। দাম ও চার্জিং স্পিডের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ব্র্যান্ডের আস্থা, বিস্তৃত সার্ভিস নেটওয়ার্ক ও অসাধারণ ফিচারের কারণে এটি ইতিমধ্যেই বাজারে বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

