নিউজ ডেস্ক: অ্যাপল আবারও পিছিয়ে দিল তাদের বহুল প্রতীক্ষিত স্মার্ট হোম হাবের উন্মোচন। প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল ২০২৫ সালেই বাজারে আসবে এই ডিভাইস, কিন্তু সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানা গেছে, এখন লক্ষ্য ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়। ব্লুমবার্গের সাংবাদিক মার্ক গুরম্যানের তথ্যানুযায়ী, এই বিলম্বের প্রধান কারণ হচ্ছে Apple Intelligence সংস্করণের সিঁড়ি (Siri)। নতুন প্রজন্মের সিঁড়িকে আরও ব্যক্তিগতকৃত, প্রাসঙ্গিকতা-সচেতন এবং বহুমুখী করার জন্য তৈরি করা হচ্ছে বিশাল ভাষা মডেলের (LLM) ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু কাজটি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি সময়সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর যেহেতু হাবটির অনেকগুলো ফিচার সরাসরি এই উন্নত সিঁড়ির ওপর নির্ভরশীল, তাই প্রকল্পের নির্ধারিত সময়সীমা পিছিয়ে গেছে। এর ফলে স্মার্ট হোম কন্ট্রোল বাজারে অ্যাপলের প্রবেশ প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যামাজন বা গুগলের তুলনায় ধীরগতিতে ঘটবে, যারা ইতোমধ্যেই নিজেদের ডিভাইস গ্রাহকদের ঘরে পৌঁছে দিয়েছে।
অভ্যন্তরীণভাবে J490 নামে পরিচিত এই হাবটিকে গড়ে তোলা হচ্ছে একটি ৭ ইঞ্চি ডিসপ্লে ও স্পিকার মিলিয়ে। এর নকশা অনেকটাই গুগল নেস্ট হাবের মতো হলেও অ্যাপলের স্বকীয় ছোঁয়া থাকবে। গুরম্যান জানাচ্ছেন, ডিভাইসটির হবে বর্গাকার আকৃতি, পাতলা কালো বা সাদা বেজেল, কোণাগুলো গোলাকার আর নিচে থাকবে গম্বুজের মতো একটি বেস। সামনে থাকবে একটি ক্যামেরা, যা ব্যবহারকারীর মুখ চিনতে পারবে। এর ফলে পরিবারের যে সদস্য কাছে আসবে, তার জন্য ব্যক্তিগতকৃত তথ্য স্ক্রিনে ভেসে উঠবে। অর্থাৎ এটি হবে একেবারে পারিবারিক ব্যবহারের জন্য পরিকল্পিত এককেন্দ্রিক ডিভাইস।
অ্যাপল এই প্রকল্পের জন্য তৈরি করছে একেবারে নতুন একটি অপারেটিং সিস্টেম, যার নাম Charismatic। এটি বিশেষভাবে শেয়ারড ফ্যামিলি ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হচ্ছে। এর ইন্টারফেসে থাকবে বিভিন্ন ঘড়ির মুখ, উইজেট আকারে অ্যাপলের নিজস্ব অ্যাপের তথ্য, আর থাকবে সিঁড়ির নতুন ভার্চুয়াল উপস্থিতি। শোনা যাচ্ছে, সিঁড়ির এই ভিজ্যুয়াল অবতার হয়তো ম্যাকের ফাইন্ডার আইকনের অনুপ্রেরণায় তৈরি হবে। এর ফলে শুধু ভয়েস নয়, ব্যবহারকারীরা চোখেও দেখতে পাবেন এক নতুন রূপের এআই সহকারীকে।
ডিভাইসটিতে চালানো যাবে অ্যাপলের নিজস্ব নেটিভ অ্যাপ—যেমন ক্যালেন্ডার, মিউজিক, নোটস, রিমাইন্ডারস ও ক্যামেরা। তবে এর নিজস্ব কোনো অ্যাপ স্টোর থাকছে না। নিয়ন্ত্রণের প্রধান মাধ্যম হবে ভয়েস কমান্ড, আর টাচস্ক্রিন থাকবে সেকেন্ডারি বিকল্প হিসেবে। এখানে সবচেয়ে বড় বাজি ধরা হচ্ছে LLM-চালিত নতুন সিঁড়িকে। এই সংস্করণ ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্যকে কাজে লাগিয়ে একাধিক অ্যাপ ও ডিভাইসের ওপর জটিল কাজ সম্পন্ন করতে পারবে।
প্রথমে পরিকল্পনা ছিল iOS 18 থেকেই এই নতুন সিঁড়ি আনা হবে। কিন্তু এখন সেটির পূর্ণাঙ্গ রূপ দেখা যাবে ২০২৫ সালে, আর আইফোন ও আইপ্যাডের জন্য পুনঃনকশা করা ভিজ্যুয়াল সংস্করণ আসবে ২০২৬ সালে। এর মানে হলো, অ্যাপল তাদের সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যারের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সামঞ্জস্য আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যদিও প্রক্রিয়াটি প্রত্যাশার তুলনায় ধীরগতির।
গুরম্যান আরও জানিয়েছেন, অ্যাপল নিজেদের এআই মডেল যেমন পরীক্ষা করছে, তেমনি ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের মতো কোম্পানির মডেলও বিবেচনায় রেখেছে সিঁড়ির জন্য। এখনো চূড়ান্ত কোনো পথ বেছে নেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। অন্যদিকে, ক্যারিসম্যাটিক ও সিঁড়ির কাজ ভবিষ্যতের আরেকটি প্রকল্পেরও ভিত্তি তৈরি করছে। গুঞ্জন রয়েছে, অ্যাপল ২০২৭ সালের জন্য একটি টেবিল-টপ রোবট তৈরি করছে। এই রোবটের মাথায় থাকবে একটি ডিসপ্লে, যা একটি রোবোটিক আর্মের মাধ্যমে নড়াচড়া করতে পারবে—ঝুঁকবে, ঘুরবে, ফলে ব্যবহারকারীর সঙ্গে আরও ইন্টারঅ্যাকটিভ অভিজ্ঞতা তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে অ্যাপলের স্মার্ট হোম হাব এখনো অনিশ্চয়তায় ঘেরা। বাজারে আসতে সময় লাগছে, কিন্তু বিলম্বের আড়ালে চলছে বিশাল এক প্রযুক্তিগত রূপান্তরের কাজ। অ্যামাজন ও গুগল যেখানে বহু আগেই নিজেদের ডিভাইস গ্রাহকদের ঘরে বসিয়ে দিয়েছে, অ্যাপল সেখানে ধীরে ধীরে একেবারে নতুন অভিজ্ঞতা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো, বিলম্বের কারণে তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে নাকি আরও সমৃদ্ধ, আরও উন্নত এআই-চালিত স্মার্ট হোম অভিজ্ঞতা দিয়ে এক লাফে বাজারের শীর্ষে উঠে আসবে। উত্তরটা পাওয়া যাবে কেবল সময়ের সঙ্গেই।

