নিউজ ডেস্ক: স্মার্টফোন বাজারে আবারও বড়সড় চমক নিয়ে এসেছে গুগল। প্রযুক্তির এই দৌড়ে যেখানে প্রতিদিন নতুন নতুন উদ্ভাবন মানুষের হাতে এসে পৌঁছায়, সেখানে এবার গুগল এক ধাপ এগিয়ে গেল প্রতিযোগীদের থেকে। সম্প্রতি কোম্পানিটি একসঙ্গে বাজারে এনেছে একাধিক নতুন স্মার্টফোন মডেল—পিক্সেল ১০, পিক্সেল ১০ প্রো, পিক্সেল ১০ প্রো এক্সএল এবং পিক্সেল ১০ প্রো ফোল্ড। তবে এই চারটি মডেলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে পিক্সেল ১০ প্রো ফোল্ড, আর তার পেছনে কারণও যথেষ্ট শক্তিশালী। গুগল তাদের এই নতুন প্রজন্মের স্মার্টফোনে এমন এক অনন্য ফিচার যুক্ত করেছে যা একেবারেই যুগান্তকারী।
স্মার্টফোনে হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার আজকের দিনে সবার জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেসেজিং, অডিও ও ভিডিও কল—প্রতিদিনের যোগাযোগের প্রায় ৭০ শতাংশ এখন হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে হয়। কিন্তু একটি সীমাবদ্ধতা সবসময়ই ছিল। দুর্বল নেটওয়ার্ক কিংবা কোনো নেটওয়ার্কহীন এলাকায় হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করা প্রায় অসম্ভব। গুগলের নতুন পিক্সেল ১০ প্রো ফোল্ড সেই সমস্যার সমাধান নিয়ে এসেছে। এই স্মার্টফোনে এমন একটি বৈপ্লবিক প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে, যা ব্যবহারকারীদের ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়াই হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করতে দেবে।
এই নতুন প্রযুক্তির মূল রহস্য লুকিয়ে রয়েছে স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের ব্যবহারে। গুগল ঘোষণা করেছে যে পিক্সেল ১০ প্রো ফোল্ডে স্যাটেলাইটের সাহায্যে হোয়াটসঅ্যাপে চ্যাট, অডিও কল এবং ভিডিও কল—সবই করা যাবে। অর্থাৎ, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে, যেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই, এমনকি ওয়াই-ফাইয়ের সুযোগও নেই, সেখানেও ব্যবহারকারীরা সহজে সংযোগ বজায় রাখতে পারবেন। এটি নিঃসন্দেহে এক নতুন যুগের সূচনা করতে চলেছে, বিশেষ করে যোগাযোগ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে।
গুগল জানিয়েছে, এই ফিচারটি আপাতত কিছু নির্দিষ্ট স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করবে। ব্যবহারকারীদের হয়তো এই সুবিধা ব্যবহারের জন্য অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হতে পারে। যদিও গুগল এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি, তবে অনুমান করা হচ্ছে যে প্রাথমিকভাবে এই সেবা সীমিত অঞ্চলে এবং নির্দিষ্ট সাবস্ক্রিপশন প্ল্যানের অধীনে দেওয়া হবে।
এখানে উল্লেখ করার মতো একটি বড় দিক হলো, অ্যাপলও ইতিমধ্যেই তাদের আইফোনে স্যাটেলাইট সংযোগ ফিচার চালু করেছে। তবে অ্যাপলের সেই ফিচার এখন পর্যন্ত কেবল জরুরি টেক্সট মেসেজ পাঠানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। উদাহরণস্বরূপ, কোনো দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে আটকে পড়লে ব্যবহারকারীরা অ্যাপলের আইফোন থেকে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে জরুরি বার্তা পাঠাতে পারেন। কিন্তু গুগল এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা অনেক বেশি শক্তিশালী ও কার্যকর। গুগলের নতুন পিক্সেল ১০ প্রো ফোল্ডে ব্যবহারকারীরা কেবল টেক্সট মেসেজই নয়, সরাসরি অডিও ও ভিডিও কলও করতে পারবেন।
আরও পড়ুনঃ VIVO T4 PRO 5G ফ্ল্যাগশিপ ফিচার সহ নতুন প্রিমিয়াম স্মার্টফোন, সাশ্রয়ী দামে
এই বৈপ্লবিক উন্নয়ন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হবে পাহাড়ি এলাকা, দুর্গম দ্বীপ, গভীর বনাঞ্চল বা মরুভূমির মতো জায়গায় বসবাসকারী বা ভ্রমণকারীদের জন্য। আগে যেখানে নেটওয়ার্ক না থাকার কারণে একেবারেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে হতো, সেখানে এখন গুগলের এই নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারকারীদের একেবারে নতুন এক অভিজ্ঞতা দেবে। যেমন ধরুন, আপনি হিমালয়ের উচ্চতম চূড়ায় কোনো অভিযানে আছেন, অথবা কোনো দুর্গম দ্বীপে ভ্রমণে গিয়েছেন, যেখানে মোবাইল নেটওয়ার্কের ছিটেফোঁটাও নেই। এমন পরিস্থিতিতেও পিক্সেল ১০ প্রো ফোল্ড আপনাকে স্যাটেলাইটের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ ঘটিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেবে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, গুগলের এই পদক্ষেপ স্মার্টফোন বাজারে নতুন এক প্রতিযোগিতার সূচনা করবে। এখন পর্যন্ত যে কয়েকটি কোম্পানি স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যোগাযোগের সুবিধা দিয়েছে, তাদের মধ্যে গুগলের এই উদ্যোগ অনেকটাই অগ্রসর। কারণ এখানে শুধু জরুরি পরিস্থিতির কথা মাথায় রাখা হয়নি, বরং সাধারণ ব্যবহারকারীর দৈনন্দিন যোগাযোগকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ভবিষ্যতে এমন এক বিশ্ব কল্পনা করা যায় যেখানে মোবাইল নেটওয়ার্কের সীমাবদ্ধতা একেবারেই থাকবে না।
গুগল তাদের অফিশিয়াল এক্স (পূর্বে টুইটার) হ্যান্ডলে ঘোষণা করেছে যে ২৮ আগস্ট থেকে স্যাটেলাইট ভিত্তিক হোয়াটসঅ্যাপ কলিং ফিচারটি চালু হবে। ঠিক একই দিনে বাজারে আনুষ্ঠানিকভাবে বিক্রি শুরু হবে পিক্সেল ১০ সিরিজের স্মার্টফোন। ব্যবহারকারীরা যখন এই ফিচারটি ব্যবহার করবেন, তখন ফোনের স্ক্রিনে একটি ছোট স্যাটেলাইট আইকন দেখা যাবে। এই আইকনটি দেখেই বোঝা যাবে যে কলটি সরাসরি স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
প্রযুক্তির জগতে গুগলের এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে এক বড় মাইলফলক। কারণ, এতদিন পর্যন্ত যেসব যোগাযোগ প্রযুক্তি আমরা ব্যবহার করেছি, সেগুলোর প্রায় সবই মোবাইল টাওয়ার ও ইন্টারনেট সংযোগের উপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু গুগলের এই নতুন উদ্ভাবন সেই সীমাবদ্ধতা ভেঙে যোগাযোগের এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। এমনকি, বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু স্মার্টফোন বাজারেই নয়, জরুরি পরিষেবা, পর্যটন, সামরিক যোগাযোগ এবং দূরবর্তী চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রেও বিপ্লব ঘটাবে।
স্যাটেলাইটের মাধ্যমে হোয়াটসঅ্যাপ কলিং সুবিধা ব্যবহারকারীদের জন্য নানা দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় যখন প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ে, তখন এই ফিচারটি জীবন বাঁচাতে সাহায্য করতে পারে। ২০২৩ সালের তুরস্ক-সিরিয়া ভূমিকম্পে দেখা গিয়েছিল যে নেটওয়ার্ক না থাকায় অনেক মানুষ সময়মতো সাহায্য চাইতে পারেননি। সেই অভিজ্ঞতার পর এমন একটি প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে আরও বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।
তবে সব সুবিধার সঙ্গে সঙ্গে কিছু সীমাবদ্ধতা এবং চ্যালেঞ্জও থাকবে। গুগল আপাতত এই ফিচারটি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কে চালু করছে। এর ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যবহারকারীর সংখ্যা সীমিত থাকতে পারে। পাশাপাশি, স্যাটেলাইট যোগাযোগ প্রযুক্তি সাধারণ মোবাইল নেটওয়ার্কের তুলনায় ব্যয়বহুল হওয়ায় এর খরচও তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। যদিও গুগল এখনই কোনো অফিসিয়াল মূল্য তালিকা ঘোষণা করেনি, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে এই সুবিধার জন্য আলাদা সাবস্ক্রিপশন প্ল্যান চালু করা হতে পারে।
তবে গুগল যে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে, তা স্পষ্ট। কোম্পানির লক্ষ্য শুধু প্রিমিয়াম ব্যবহারকারীদের জন্য নতুন ফিচার আনা নয়, বরং বিশ্বব্যাপী সংযোগের ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করা। এমনকি ভবিষ্যতে গুগল অন্যান্য জনপ্রিয় মেসেজিং ও কলিং অ্যাপের সঙ্গেও এই স্যাটেলাইট প্রযুক্তি যুক্ত করতে পারে। যদি এমনটা ঘটে, তবে কেবল হোয়াটসঅ্যাপ নয়, গুগল মিট, টেলিগ্রাম, সিগন্যাল কিংবা মেসেঞ্জারের মতো প্ল্যাটফর্মেও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে কল করার সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।
স্মার্টফোন প্রযুক্তির উন্নয়ন গত কয়েক বছরে দ্রুততর হয়েছে। ফোল্ডেবল ফোনের বাজারে গুগলের প্রবেশও সেই উন্নয়নের অংশ। পিক্সেল ১০ প্রো ফোল্ড শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত দিক থেকে নয়, ডিজাইন, পারফরম্যান্স ও ফিচারের দিক থেকেও বেশ উন্নত। ব্যবহারকারীরা একসঙ্গে ফোল্ডেবল স্ক্রিনের সুবিধা এবং স্যাটেলাইট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সীমাহীন যোগাযোগের সুযোগ পেয়ে যাবেন।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ফিচার চালু হওয়ার পর গুগলের পিক্সেল সিরিজ আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারে। কারণ বাজারে এখনো এমন কোনো ফোন নেই যা ব্যবহারকারীদের দৈনন্দিন জীবনে ইন্টারনেটবিহীন ভিডিও কল করার স্বাধীনতা দেয়। অ্যাপলের ফিচার জরুরি অবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, গুগলের এই উদ্যোগ সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য বাস্তবিক ও বহুমুখী সমাধান নিয়ে এসেছে।
গুগলের এই নতুন পদক্ষেপ কেবল প্রযুক্তিগত উন্নয়নের নিদর্শন নয়, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সংযোগের ধারণাকেই নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে, যেকোনো পরিস্থিতিতে প্রিয়জনের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুযোগ এখন হাতের মুঠোয়। এই বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিঃসন্দেহে আগামী দিনের যোগাযোগের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

