নিউজ ডেস্ক: ভারতীয় অটোমোবাইল বাজারে টয়োটা কির্লোস্কার মোটর আবারও প্রমাণ করল তাদের অদম্য উপস্থিতি। সংস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করেছে তাদের জনপ্রিয় প্রিমিয়াম হাইব্রিড সেডান ক্যামরির এক নতুন সংস্করণ—ক্যামরি হাইব্রিড ইলেকট্রিক স্প্রিন্ট এডিশন। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্যামরি ভারতের গাড়িপ্রেমীদের মনে বিশেষ জায়গা দখল করে রেখেছে। বিলাসবহুল সেডান হিসেবে এর উপস্থিতি একদিকে যেমন আরামের প্রতীক, তেমনি অন্যদিকে এটি উন্নত প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গির এক প্রতিফলন। সেই দীর্ঘ ঐতিহ্যকে আরও আধুনিক, আরও ক্রীড়ামুখী রূপ দিতে টয়োটা এনেছে এই স্প্রিন্ট এডিশন, যার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৮.৫০ লক্ষ টাকা (এক্স-শোরুম, সারা ভারত)।
গাড়িটির বাহ্যিক রূপে আনা হয়েছে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। এই সংস্করণে দেওয়া হয়েছে ডুয়াল-টোন বা দ্বৈত রঙের নকশা, যেখানে হুড, ছাদ এবং ট্রাঙ্কে ব্যবহার করা হয়েছে আকর্ষণীয় ম্যাট ব্ল্যাক অ্যাকসেন্ট। এর সঙ্গে মানানসইভাবে যুক্ত হয়েছে নতুন ম্যাট ব্ল্যাক অ্যালয় হুইল, যা গাড়ির চরিত্রে এনে দিয়েছে দৃঢ়তা ও স্পোর্টস কারের আবহ। শুধু তাই নয়, টয়োটা বিশেষভাবে এই সংস্করণে যুক্ত করেছে এক্সক্লুসিভ স্পোর্টস কিট। এর মধ্যে রয়েছে ফ্রন্ট ও রিয়ার বডি কিট এবং একটি রিয়ার স্পয়লার, যা গাড়ির ভঙ্গিমাকে করেছে আরও আগ্রাসী ও আধুনিক। ফলে, ক্যামরি স্প্রিন্ট এডিশন শুধুই একটি বিলাসবহুল সেডান নয়, বরং এটি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে নিজেদের এক অনন্য পরিচয়ে।
আরও পড়ুনঃ ফিলিপস হিউ ব্রিজ প্রো , প্রায় এক দশক পর স্মার্ট লাইটিং দুনিয়ায় বড় আপগ্রেড
গাড়ির ভেতরে পা রাখলেই বোঝা যায় বিলাসিতা ও আরামের প্রতি টয়োটার প্রতিশ্রুতি কতটা দৃঢ়। যাত্রীদের সুবিধার জন্য দেওয়া হয়েছে ভেন্টিলেটেড ফ্রন্ট সিট, যা গরম আবহাওয়ায় দীর্ঘ যাত্রাকেও করে তোলে প্রশান্তিময়। চালকের জন্য রয়েছে হেড-আপ ডিসপ্লে, যা ড্রাইভিংয়ের সময় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরাসরি চোখের সামনে প্রজেক্ট করে দেয়, ফলে রাস্তা থেকে চোখ সরাতে হয় না। ড্রাইভিং অভিজ্ঞতাকে আরও গতিশীল করতে যুক্ত করা হয়েছে প্যাডল শিফটার, আর ফোন বা অন্যান্য ডিভাইস চার্জ করার জন্য রয়েছে ওয়্যারলেস চার্জিং সুবিধা। গাড়ির চালকের আসনে থাকছে ১০ দিক থেকে নিয়ন্ত্রিত পাওয়ার অ্যাডজাস্টমেন্ট এবং মেমরি ফাংশন, যাতে একাধিক ব্যবহারকারীর পছন্দমতো সেটিং সহজেই রাখা যায়। এছাড়াও পুরো কেবিন জুড়ে ব্যবহৃত হয়েছে নরম অ্যাম্বিয়েন্ট লাইটিং, যা রাত্রিকালীন যাত্রাকে করে তোলে আরও মনোমুগ্ধকর।
শক্তি ও পারফরম্যান্সের দিক থেকেও এই সংস্করণে রয়েছে অনন্য বৈশিষ্ট্য। গাড়ির মূল শক্তি আসছে ২.৫ লিটার ডাইনামিক ফোর্স পেট্রোল ইঞ্জিন থেকে, যা যুক্ত হয়েছে ই-সিভিটি গিয়ারবক্সের সঙ্গে। এর পাশাপাশি রয়েছে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি। ইঞ্জিন ও ব্যাটারির এই সমন্বয় মিলে গাড়িটি উৎপন্ন করছে ২৩০ বিএইচপি শক্তি, যা প্রিমিয়াম সেডান সেগমেন্টে যথেষ্ট প্রশংসনীয়। শুধু শক্তিই নয়, ক্যামরি স্প্রিন্ট এডিশন জ্বালানি দক্ষতার ক্ষেত্রেও শীর্ষস্থানে। টয়োটার পঞ্চম প্রজন্মের হাইব্রিড প্রযুক্তির সৌজন্যে এটি প্রতি লিটার পেট্রোলে ২৫.৪৯ কিলোমিটার পর্যন্ত মাইলেজ দিতে সক্ষম। এর ফলে গাড়িটি কেবলমাত্র শক্তিশালী ও আরামদায়ক নয়, বরং পরিবেশবান্ধব ও অর্থনৈতিকভাবেও সাশ্রয়ী। ড্রাইভার চাইলে তিনটি আলাদা মোডে গাড়িটি চালাতে পারবেন—ইকো, নরমাল এবং স্পোর্ট। পরিস্থিতি ও চালকের মুড অনুযায়ী এই মোডগুলির সাহায্যে ড্রাইভিং অভিজ্ঞতা পরিবর্তন করা সম্ভব।
আরও পড়ুনঃ Mahindra Vision SXT: মহিন্দ্রার নতুন চমক ভিশন SXT
নিরাপত্তার প্রশ্নে টয়োটা সবসময়ই বাড়তি গুরুত্ব দিয়েছে এবং স্প্রিন্ট এডিশনও তার ব্যতিক্রম নয়। গাড়িটিতে যুক্ত করা হয়েছে টয়োটা সেফটি সেন্স ৩.০ প্যাকেজ, যা আন্তর্জাতিক মানের এক আধুনিক সুরক্ষা ব্যবস্থা। এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে প্রি-কলিশন সিস্টেম, যা সম্ভাব্য দুর্ঘটনার আগেই চালককে সতর্ক করে দেয়; লেন ট্রেসিং অ্যাসিস্ট ও লেন ডিপার্চার অ্যালার্ট, যা গাড়িকে নিজের লেনে রাখে ও প্রয়োজনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশোধন করে; অ্যাডাপটিভ ক্রুজ কন্ট্রোল, যা সামনের গাড়ির গতির সঙ্গে মিলিয়ে নিজের গতি নিয়ন্ত্রণ করে; এবং অটোমেটিক হাই বিম, যা রাতের যাত্রায় বাড়তি সুরক্ষা দেয়। শুধু তাই নয়, গাড়িটিতে রয়েছে ৯টি এয়ারব্যাগ, ভেহিকল স্টেবিলিটি কন্ট্রোল, ট্র্যাকশন কন্ট্রোল, হিল স্টার্ট অ্যাসিস্ট এবং ৩৬০-ডিগ্রি প্যানোরামিক ভিউ মনিটর। ফলে, যাত্রী ও চালক উভয়ের জন্যই এই গাড়ি তৈরি করছে এক নিরাপদ আশ্রয়।
উন্মোচনের সময় টয়োটা কির্লোস্কার মোটরের ভাইস প্রেসিডেন্ট (সেলস, সার্ভিস ও ইউজড কার বিজনেস) বরিন্দর ওয়াধওয়া বলেন, ক্যামরি স্প্রিন্ট এডিশন হলো টয়োটার গ্রাহক-কেন্দ্রিক ভাবনার প্রতিফলন। তাঁর ভাষায়, “গাড়িটির স্পোর্টিয়ার চরিত্র, দ্বৈত-রঙের নকশা, সাহসী ম্যাট ব্ল্যাক অ্যালয় হুইল এবং এক্সক্লুসিভ স্পোর্টস কিট আধুনিক গ্রাহকদের চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। একই সঙ্গে এটি টয়োটার
টেকসই গতিশীলতার প্রতিশ্রুতিকেও আরও দৃঢ় করে।” তাঁর এই বক্তব্য স্পষ্ট করে দেয় যে গাড়িটি শুধু একটি প্রোডাক্ট নয়, বরং এটি টয়োটার একটি ভিশন, যেখানে গ্রাহকের প্রয়োজন ও ভবিষ্যতের পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি একসঙ্গে মিশে গেছে।
আরও পড়ুনঃ অ্যাপলের স্মার্ট হোম, সিঁড়ির এআই রূপান্তর আর প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ
রঙের ক্ষেত্রে টয়োটা এই সংস্করণে এনেছে আকর্ষণীয় বৈচিত্র্য। স্প্রিন্ট এডিশন পাওয়া যাবে পাঁচটি ভিন্ন দ্বৈত-রঙের কম্বিনেশনে। এর মধ্যে রয়েছে ইমোশনাল রেড ও ম্যাট ব্ল্যাক, প্লাটিনাম হোয়াইট পার্ল ও ম্যাট ব্ল্যাক, এবং ডার্ক ব্লু মেটালিক ও ম্যাট ব্ল্যাক। প্রতিটি রঙের সমন্বয়ই গাড়ির স্পোর্টস চরিত্রকে আরও ফুটিয়ে তোলে এবং বাজারে অন্য গাড়ির ভিড়ের মধ্যে এটিকে করে তোলে আলাদা।
হাইব্রিড প্রযুক্তি নিয়ে ক্রেতাদের মনে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরযোগ্যতা ও ব্যাটারির স্থায়িত্ব নিয়ে। সেই চিন্তা দূর করতে টয়োটা এই স্প্রিন্ট এডিশনের জন্য ঘোষণা করেছে বিশেষ ওয়ারেন্টি। হাইব্রিড ব্যাটারির ক্ষেত্রে দেওয়া হচ্ছে ৮ বছর বা ১,৬০,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত ওয়ারেন্টি। এই দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা গ্রাহকদের মনে আস্থা যোগাবে এবং তাঁদের হাইব্রিড প্রযুক্তির প্রতি বিশ্বাস আরও দৃঢ় করবে।
ভারতীয় বাজারে প্রিমিয়াম হাইব্রিড সেডানের প্রতিযোগিতা খুব বেশি না হলেও, মার্সিডিজ, বিএমডব্লিউ কিংবা অডির মতো সংস্থাগুলির বিলাসবহুল মডেলগুলি সবসময়ই আলোচনায় থাকে। তবুও, ক্যামরির জায়গা আলাদা। এটি এমন এক মডেল, যা বিলাসিতা, শক্তি ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির সমন্বয়ে তৈরি। স্প্রিন্ট এডিশন সেই সমন্বয়কে আরও আধুনিক করেছে এবং যুক্ত করেছে স্পোর্টস কারের ভাবধারা। ফলে, যারা একদিকে কর্পোরেট ব্যবহার বা দীর্ঘ যাত্রার জন্য বিলাসিতা চান, আর অন্যদিকে গাড়ির চেহারায় চান ক্রীড়ামুখী চরিত্র—তাঁদের জন্য ক্যামরি স্প্রিন্ট এডিশন নিখুঁত পছন্দ হতে চলেছে।
টয়োটা কির্লোস্কার মোটর ভারতের বাজারে নিজেদের উপস্থিতি ক্রমশ বাড়িয়ে তুলছে এবং বিশেষত হাইব্রিড প্রযুক্তির ক্ষেত্রে তারা পথিকৃৎ। বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রিয়াসের মতো মডেলের মাধ্যমে টয়োটা যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, তারই প্রয়োগ ঘটেছে এই ক্যামরিতে। বর্তমান সময়ে পরিবেশ দূষণ ও জ্বালানি সংকটের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গেলে হাইব্রিড প্রযুক্তির বিকল্প নেই। এই প্রেক্ষাপটে ক্যামরি স্প্রিন্ট এডিশন কেবল একটি গাড়ি নয়, বরং এক নতুন যুগের প্রতীক।
গ্রাহকদের জন্য ইতিমধ্যেই বুকিংয়ের সুযোগ খুলে দিয়েছে টয়োটা। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের পাশাপাশি দেশের সর্বত্র টয়োটা ডিলারশিপে গিয়ে এই নতুন সংস্করণ বুক করা যাচ্ছে। বাজারে এর উপস্থিতি যে আলোড়ন তুলবে, তা বলাই বাহুল্য।

