নিউজ ডেস্ক –জার্মানির বিখ্যাত এটিপি অটোমোটিভ টেস্টিং পাপেনবার্গ ট্র্যাকে আবারও ইতিহাস তৈরি হলো। ২০২৫ সালের ৮ আগস্ট, চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা বিওয়াইডি (BYD)-এর বিলাসবহুল পারফরম্যান্স ব্র্যান্ড ইয়াংওয়াং (Yangwang) তাদের নতুন সুপারকার U9 ট্র্যাক এডিশন দিয়ে এক অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়েছে। গাড়িটি ঘন্টায় ৪৭২.৪১ কিলোমিটার গতিবেগ ছুঁয়ে, বিশ্বের দ্রুততম ইলেকট্রিক গাড়ির খেতাব নিজেদের করে নিয়েছে। এই অর্জন শুধুমাত্র ইলেকট্রিক গাড়ির জন্য নয়, বরং বিশ্বব্যাপী সুপারকার পারফরম্যান্সের নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে।
এই অসাধারণ সাফল্যের মাধ্যমে ইয়াংওয়াং U9 ট্র্যাক এডিশন পরাজিত করেছে আগের রেকর্ডধারী আস্পার্ক OWL SP600-কে, যেটি ২০২৪ সালে একই ট্র্যাকে ঘন্টায় ৪৩৮.৭ কিলোমিটার গতিতে পৌঁছেছিল। রেকর্ডব্রেকিং এই ড্রাইভের পেছনে ছিলেন অভিজ্ঞ জার্মান পেশাদার রেসিং ড্রাইভার মার্ক বাসেং, যিনি আগের বছরের আস্পার্ক OWL SP600-এর রেকর্ড রানও পরিচালনা করেছিলেন। তবে এবারের প্রচেষ্টা ভিন্নতর ছিল, কারণ ইয়াংওয়াং তাদের U9 ট্র্যাক এডিশনকে বিশেষভাবে সাজিয়েছে কেবলমাত্র অতিরিক্ত গতি ও স্থিতিশীলতার জন্য।
U9 ট্র্যাক এডিশন মূলত তাদের রোড-লিগ্যাল U9-এর একটি উন্নত সংস্করণ। তবে এর ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে আনা হয়েছে ব্যাপক পরিবর্তন, যা গতি, নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একেবারে নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছে। গাড়ির কেন্দ্রে রয়েছে ইয়াংওয়াং-এর e4 প্ল্যাটফর্ম, যা একটি অত্যাধুনিক কোয়াড-মোটর সেটআপ। এখানে চারটি শক্তিশালী মোটর প্রতিটি ৩০,০০০ RPM পর্যন্ত ঘুরতে সক্ষম এবং প্রতিটির পাওয়ার আউটপুট ৭৫৫bhp। চারটি মোটরের সম্মিলিত শক্তি এক কথায় বিস্ময়কর—৩,০০০bhp-এর বেশি। এর ফলে গাড়ির পাওয়ার-টু-ওয়েট রেশিও দাঁড়িয়েছে ১,২১৭hp/টন, যা কিংবদন্তি Koenigsegg One:1-এর থেকেও বেশি।
ইয়াংওয়াং U9 ট্র্যাক এডিশনে শুধু শক্তিই নয়, রয়েছে প্রযুক্তির এক অনন্য সংমিশ্রণ। গাড়িটিতে যুক্ত হয়েছে DiSus-X ইন্টেলিজেন্ট বডি কন্ট্রোল সিস্টেম, যা প্রতিটি চাকা আলাদাভাবে এবং রিয়েল-টাইমে সামঞ্জস্য করে। এই সাসপেনশন প্রযুক্তি গাড়ির ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে, বিশেষ করে হঠাৎ ত্বরান্বিত হওয়া বা তীব্র বাঁক নেওয়ার সময়। এত উচ্চ গতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ, কিন্তু এই উন্নত সিস্টেমের জন্যই মার্ক বাসেং ৪৭২ কিমি/ঘন্টা গতিবেগে গাড়িটিকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।
এই রেকর্ড প্রচেষ্টার জন্য ইয়াংওয়াং একটি বিশেষ সহযোগিতা গড়ে তোলে Giti Tire-এর সঙ্গে। তারা একসঙ্গে তৈরি করেছে একচেটিয়া বেসপোক সেমি-স্লিক টায়ার, যা চরম গতিতে তীব্র চাপ এবং ঘর্ষণ সহ্য করতে সক্ষম। সাধারণ টায়ারে এত গতি সহনীয় নয়, কিন্তু এই কাস্টম টায়ারগুলোই গাড়ির নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করেছে। এর পাশাপাশি, গাড়ির ডিজাইনে যুক্ত করা হয়েছে কার্বন-ফাইবার স্প্লিটার যা বায়ুপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে এবং উচ্চ গতিতে গাড়িকে আরও নিচু এবং স্থিতিশীল রাখে।
তাপ নিয়ন্ত্রণও এমন গতির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অতিরিক্ত ঘর্ষণে ইঞ্জিন, ব্যাটারি ও মোটরের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। ইয়াংওয়াং U9 ট্র্যাক এডিশনে উন্নত থার্মাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম যুক্ত করা হয়েছে, যা ইঞ্জিন ও ব্যাটারিকে সর্বোচ্চ কর্মক্ষম অবস্থায় রাখতে সাহায্য করে। শুধু তাই নয়, গাড়িটিতে রয়েছে বিশ্বের প্রথম ১২০০V ম্যাস-প্রোডিউসড প্ল্যাটফর্ম, যা অতিরিক্ত শক্তি সরবরাহের পাশাপাশি ব্যাটারির দক্ষতা বৃদ্ধি করেছে। এই প্রযুক্তি শুধু গতি বাড়ায় না, বরং ধারাবাহিকভাবে সেই গতি বজায় রাখতেও সক্ষম করে।
গাড়ির ডিজাইনের দিক থেকেও ইয়াংওয়াং U9 ট্র্যাক এডিশন তাদের স্ট্যান্ডার্ড U9 মডেলের কাছাকাছি, তবে কার্যকারিতার দিক থেকে অনেক এগিয়ে। এর এরোডাইনামিক ডিজাইন, সুনির্দিষ্ট কার্বন ফাইবার কাঠামো এবং উন্নত কুলিং সিস্টেম একে একাধারে দৃষ্টিনন্দন ও প্রযুক্তিগতভাবে অসাধারণ করে তুলেছে। ফলে, এটি কেবল একটি ইলেকট্রিক সুপারকার নয়; বরং টেকসই গতিশক্তির নতুন প্রতীক।
ইয়াংওয়াং-এর এই রেকর্ডব্রেকিং সাফল্য শুধুমাত্র ইলেকট্রিক গাড়ির ক্ষেত্রেই নয়, বরং প্রচলিত পেট্রোলচালিত হাইপারকারগুলোকেও সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। এতদিন পর্যন্ত সর্বোচ্চ গতির তালিকায় প্রাধান্য ছিল Bugatti Chiron Super Sport 300+ এবং Koenigsegg Jesko Absolut-এর মতো পেট্রোলচালিত সুপারকারগুলোর হাতে। কিন্তু ইয়াংওয়াং প্রমাণ করে দিল যে বৈদ্যুতিক শক্তিই ভবিষ্যৎ, এবং তা কেবল পরিবেশবান্ধব নয়, গতি ও পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রেও অতুলনীয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অর্জন শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত সীমারেখা অতিক্রম করেনি, বরং অটোমোটিভ ইন্ডাস্ট্রির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশও স্পষ্ট করে দিয়েছে। একসময় ইলেকট্রিক গাড়ি মানেই সীমিত রেঞ্জ, কম গতি এবং পারফরম্যান্সে আপস করার ধারণা ছিল। কিন্তু ইয়াংওয়াং U9 ট্র্যাক এডিশন প্রমাণ করেছে যে সঠিক গবেষণা, উন্নত প্রযুক্তি এবং শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ইলেকট্রিক গাড়িও পারফরম্যান্সের নতুন সংজ্ঞা তৈরি করতে পারে।
বিওয়াইডি’র সহায়তায় ইয়াংওয়াং এই প্রকল্পে যে পরিমাণ উদ্ভাবন ও বিনিয়োগ করেছে, তা স্পষ্টতই তাদের দীর্ঘমেয়াদী ভিশনের ইঙ্গিত দেয়। প্রতিষ্ঠানটি কেবল দ্রুতগামী গাড়ি তৈরিতেই মনোযোগ দিচ্ছে না, বরং টেকসই শক্তির সম্ভাবনাকেও সামনে নিয়ে আসছে। ৪৭২.৪১ কিমি/ঘন্টা গতি ছোঁয়া শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি ভবিষ্যতের পরিবহন ব্যবস্থার সম্ভাবনা ও সীমাহীন সম্ভাবনার প্রতীক।
ইয়াংওয়াং U9 ট্র্যাক এডিশনের এই অসাধারণ কৃতিত্ব মোটরস্পোর্টস জগতের জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা। এই রেকর্ড প্রমাণ করে দিল যে ইলেকট্রিক সুপারকারও কেবল পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রতীক নয়, বরং গতির নতুন সংজ্ঞা দিতে সক্ষম। আগামীর দিনে এই প্রযুক্তি আরও উন্নত হবে এবং এর প্রভাব কেবল রেস ট্র্যাকে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ভবিষ্যতের রোড-লিগ্যাল গাড়িগুলিতেও এর প্রয়োগ দেখা যাবে।
৪৭২.৪১ কিমি/ঘন্টা গতি পেরোনোর মাধ্যমে ইয়াংওয়াং শুধু নতুন ইতিহাস তৈরি করেনি, বরং বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছে যে ইলেকট্রিক শক্তি ভবিষ্যতের রাজপথে রাজত্ব করবে। প্রচলিত ধারণা ভেঙে, টেকসই শক্তি ও উচ্চ পারফরম্যান্সের মিশ্রণে যে নতুন যুগ শুরু হয়েছে, ইয়াংওয়াং U9 ট্র্যাক এডিশনই তার প্রথম অধ্যায়।

